
রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা ৫০ শতাংশ শুল্কের জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল, ইলেকট্রনিকস, কৃষিজ যন্ত্রপাতি, গৃহস্থালি সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করবে কানাডা।
শুক্রবার মধ্যরাত থেকে কানাডার পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার পরদিন শনিবার পাল্টা শুল্কের ঘোষণা দেন কার্নি। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বাণিজ্য অংশীদার দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরও তীব্র হলো। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে স্বাক্ষরিত উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি—ইউএসএমসিএর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অটোয়ায় কানাডার পার্লামেন্ট ভবন থেকে দেওয়া বক্তব্যে কার্নি বলেন, কানাডার শ্রমিক, কৃষক, পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে।
তিনি বলেন, ‘তারা যা প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা তা মেনে নিতে পারি না। আর তারা যা চেয়েছে, আমরা তা দেব না।’
কয়েক দফা আলোচনার পরও চুক্তি হয়নি
নতুন শুল্ক আরোপের আগে কয়েক দিন ধরে ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে নিবিড় আলোচনা চলছিল। শুক্রবার দুই দেশের মধ্যে একটি বাণিজ্যচুক্তি হতে পারে বলে আশা করেছিলেন ট্রাম্প। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের শেষ মুহূর্তের কিছু নতুন শর্তের কারণেই আলোচনা ভেস্তে যায়। তাঁর ভাষ্য, এসব শর্ত অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক ও অন্যায্য ছিল এবং এতে কানাডার সম্ভাব্য সুবিধা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
কার্নি বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু নতুন শর্ত দিয়েছে, যা মেনে নিলে যেকোনো চুক্তির নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠত। এমনকি ভবিষ্যতে কানাডার অন্য দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি করার সক্ষমতা সীমিত করার বিষয়ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবের মধ্যে ছিল বলে জানান তিনি।
এরপরই শুক্রবার মধ্যরাত থেকে কানাডার পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করে ট্রাম্প প্রশাসন।
কানাডার ২ হাজার কোটি ডলারের রপ্তানি ঝুঁকিতে
ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির আওতায় কানাডার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপণ্য পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াইন, আসবাবপত্র, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, মাছ ধরার ছিপ ও হকির সরঞ্জামসহ বিভিন্ন পণ্য।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ রপ্তানি পণ্য নতুন শুল্কের আওতায় পড়বে। দীর্ঘ ১৮ মাস ধরে ইউএসএমসিএর আওতায় কানাডার বেশির ভাগ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সেই সুবিধার বড় অংশই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
তবে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মোট যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়, তার প্রায় ৫ শতাংশই সরাসরি নতুন শুল্কের আওতায় পড়বে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
তারপরও অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, শুল্কের প্রভাব শুধু সরাসরি আক্রান্ত পণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশেষ করে নরম কাঠ, ওয়াইন, গাড়ি, স্টিল ও উৎপাদনশিল্পের মতো খাতগুলোতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান হ্রাস এবং কোনো কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের যেসব পণ্যে শুল্ক বসাবে কানাডা
কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কানাডা বেশ কিছু মার্কিন পণ্যে শুল্ক আরোপ করবে। এর মধ্যে রয়েছে—
স্টিল ও ইলেকট্রনিকস পণ্য;
দুগ্ধজাত পণ্য;
গৃহস্থালি সামগ্রী;
কৃষিজ যন্ত্রপাতি;
মণ্ড ও কাগজ;
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শিল্পপণ্য।
এ ছাড়া এর আগে যুক্তরাষ্ট্র যেসব কানাডীয় পণ্যকে শুল্কের আওতায় এনেছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কার্নি বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পাল্টা শুল্কের বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করবে কানাডার সরকার।
কানাডা তার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সংঘাতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেশটির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের কাছে ছাড় না দিয়ে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কার্নি।
‘কেউ আক্রমণ করলে আপনিও যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হন’
কানাডা কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কার্নি বলেন, কানাডা এই পরিস্থিতি নিজেরা তৈরি করেনি।
তিনি বলেন, ‘কেউ আক্রমণ করলে আপনিও যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য হন। আমরা হামলার শিকার হয়েছি।’
একই সঙ্গে কানাডার শিল্প ও অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে নতুন বাণিজ্য ও সামরিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
কার্নি আরও জানান, মার্কিন শুল্কের কারণে কানাডার যেসব শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের জন্য আগামী সপ্তাহে সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হবে। এই সহায়তা কার্যক্রম কয়েক বছর পর্যন্ত চালু থাকতে পারে।
আলোচনার দরজা আপাতত বন্ধ ওয়াশিংটনের
কানাডার পাল্টা শুল্ক ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিয়সন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, কানাডার সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।
শনিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রিয়ার বলেন, কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও তার উপযুক্ত জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, কানাডা অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে ভালো বাণিজ্যচুক্তির সুবিধা পেয়েছে এবং এবারও আরও ভালো একটি চুক্তি পাওয়ার সুযোগ ছিল। তবে কানাডা সে সুযোগ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস, মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রীর কার্যালয় ও মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের কাছে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
গাড়ি নিয়ে দর-কষাকষিতেই বড় অচলাবস্থা
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে চুক্তি না হওয়ার অন্যতম বড় কারণ ছিল গাড়িশিল্প নিয়ে মতপার্থক্য।
তিনটি সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, হালকা যানবাহনের জন্য প্রস্তাবিত সুবিধাজনক শুল্ক কাঠামো মাঝারি ও ভারী ট্রাকের ক্ষেত্রেও কার্যকর করতে চেয়েছিল কানাডা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এতে সম্মত হয়নি।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী কার্নির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান মেনে নিলে কানাডায় উৎপাদিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গাড়ি প্রস্তাবিত চুক্তির সুবিধা থেকে বাদ পড়ে যেত।
এর মধ্যে ফোর্ডের এফ-৩৫০, এফ-৪৫০ ও এফ-৫৫০ ট্রাক এবং জেনারেল মোটরসের সিলভেরাডোর মতো জনপ্রিয় মডেলও রয়েছে। ফলে কানাডার গাড়ি উৎপাদনশিল্প যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়ত।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রস্তাব কানাডার সংস্কৃতি, ভাষা ও সার্বভৌমত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলেও অভিযোগ করেছেন কার্নি। তবে ঠিক কোন কোন প্রস্তাব নিয়ে তাঁর আপত্তি, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
ইউএসএমসিএর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন
নতুন করে শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি বা ইউএসএমসিএর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
উত্তর আমেরিকার তিন দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজ করার জন্য এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কানাডার বিপুল পরিমাণ রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর হওয়ায় দেশটির অর্থনীতির জন্য চুক্তিটির গুরুত্ব আরও বেশি।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি এবং কানাডার পাল্টা পদক্ষেপের ফলে চুক্তির আওতায় থাকা শুল্কমুক্ত বাণিজ্যব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকবে, তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ী ও প্রাদেশিক সরকারের উদ্বেগ
কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যানডিস লাইং বলেছেন, নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও খাতের ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ করা হবে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হলেও এর মধ্য থেকে সম্ভাব্য সর্বোত্তম ফল বের করার চেষ্টা করা হবে।
অন্যদিকে মার্কিন শুল্কের কড়া সমালোচক অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড কানাডার পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
শনিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কানাডার জন্য প্রস্তাবিত চুক্তিতে সই না করাই ভালো হয়েছে। তাঁর মতে, ওই চুক্তি অন্টারিওর পাশাপাশি গাড়ি, স্টিল ও উৎপাদনশিল্পের জন্য ক্ষতিকর হতে পারত।
ট্রাম্পের সঙ্গে শক্ত অবস্থান কার্নির
গত বছর নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কার্নি। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কানাডার অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা অংশীদারত্ব তৈরির কথাও তিনি বলে আসছেন।
বর্তমানে কানাডায় তাঁর জনপ্রিয়তাও বেশ শক্তিশালী। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, কানাডার বেশির ভাগ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে বাণিজ্যিক বিষয়ে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার বিরোধী।
প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পোইলিভ্রেও ট্রাম্পের শুল্কনীতির সমালোচনা করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, কানাডার কর্মসংস্থান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অন্যায্য আঘাত নেমে এসেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কানাডীয়দের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্ক এবং কানাডার পাল্টা ব্যবস্থা উত্তর আমেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদারের সম্পর্কে নতুন করে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করেছে। কয়েক দিনের নিবিড় আলোচনার পরও সমঝোতা না হওয়ায় এখন তাৎক্ষণিকভাবে বাণিজ্যিক উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং পাল্টাপাল্টি শুল্কের প্রভাব শিল্প, কর্মসংস্থান ও ভোক্তা পর্যায়ে কতটা বিস্তৃত হয়, সেটিই সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।